Thursday, 1 October 2015

আকবরের আমলের রামায়ণ

সম্রাট আকবরের আমলে তাঁর ইচ্ছাক্রমে সংস্কৃত ভাষা থেকে ফার্সি ভাষাতে রামায়ণ অনুবাদ করা হয়েছিল | দীর্ঘ চার বছর ধরে এই অনুবাদ করার কাজ চলেছিল | আর এই কাজটি করেছিলেন আকবরের রাজদরবারের একজন কর্মী বদাওনি | বদাওনির এই কাজের পুরস্কার স্বরুপ সম্রাট তাঁকে বিশেষ ভাবে পুরস্কৃত করেন | এই কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসাবে তিনি একটি অশ্ব, একটি শাল এবং ' মদদ ই মাস. ' হিসাবে এক হাজার বিঘা নিষ্করভূখন্ড লাভ করেন | অতঃপর সম্রাটের অনুরোধে তিনি ফার্সীতে ' মহাভারত ' অনুবাদের কাজে হাত দেন | তবে এই অনুবাদের কাজ তিনি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি |

বর্তমান উত্তরপ্রদেশের বদাওন অঞ্চলে 1550 খ্রীঃ জন্মগ্রহণ করেন বদাওনি | তবে কারও কারও মতে তাঁর জন্ম স্থান ছিল ফতেপুর সিক্রির নিকটবর্তী গ্রাম টোডা | তাঁর প্রকৃত নাম - মোল্লা আব্দুল কাদির ইবন মুলুক্ষা | দীর্ঘ চারদশক তিনি আবুল ফজলের পিতা শেখ মুবারকের সান্নিধ্যে থেকে ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন |
এই বদাওনির সঙ্গে আবুল ফজলের প্রথম দিকে খুব ভালো সখ্যতা ছিল | কিন্তু পরবর্তীতে আবুল ফজলের সঙ্গে আকবরের বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলে বদাওনি ঈর্ষান্বিত হন | গোঁড়া সুন্নী মুসলমান বদাওনি সম্রাট আকবরের উদার ধর্মনীতি মেনে নিতে পারেননি | ফলে উভয়ের সম্পর্কে চিড় ধরে | এমনকি আকবরের প্রশাসনের তরফ থেকে তিনি যেসব সুযোগ সুবিধা ভোগ করতেন তাও বন্ধ করে দেওয়া হয় | শেষ জীবনে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় ভগ্ন হৃদয়ে বদাওনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন |

বিনয় বাদল দীনেশ

ইতিহাসের বিনয় বাদল দীনেশের কথা আমরা সকলেই শুনেছি এবং তাদের রাইটার্স বিল্ডিং অভিযানের কথাও শুনেছি যা ' অলিন্দ যুদ্ধ ' বা বারান্দা বেটল ' নামে খ্যাত | আজ সেই বিনয় বাদল দীনেশদের ছেলেবেলা সম্পর্কে আলোচনা করব | কিভাবে তাঁরা স্বাভাবিক জীবন যাপন ছেড়ে শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য জীবন দিলেন সেই ঘটনাক্রম সম্পর্কেইই আজ বলব |
বাদল গুপ্ত (1912-1930) :-----------
1912 সালে ঢাকার বিক্রমপুর এলাকার পূর্ব শিমুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বাদল গুপ্ত | তাঁর আসল নাম ছিল সুধীর গুপ্ত, তবে সকলে তাঁকে বাদল বলেই ডাকত | বাদলের পিতার নাম ছিল অবনী গুপ্ত | বাদলের পড়াশোনা শুরু হয়েছিল পিতা মাতার হাত ধরেই | প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর বাদল ভর্তি হয় ' বানারিপাড়া স্কুলে ' | ছোটো বেলা থেকেই বাদল ছিল প্রচন্ড রাগী | তবে একটু বড় হওয়ার পর তার সেই মানসিকতা পাল্টায় | স্কুলে পড়ার সময় বাদল বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিকুঞ্জ সেনের সংস্পর্শে আসে | তার সান্নিধ্য থেকেই বাদল গুপ্ত স্বদেশি রাজনীতি সঙ্গে জড়িয়ে পরে | নিকুঞ্জ সেন ছিলেন বিপ্লবী দলের সদস্য | এই শিক্ষকের হাত ধরেই খুব সম্ভবত নবম বা দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় বাদল গুপ্ত ' বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স ' ( বি.ভি) নামে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন | অল্পদিনের মধ্যেই বাদল এই সংগঠনের একজন সক্রিয় সদস্য হিসাবে নিজেকে প্রকাশ করেন |

দীনেশ গুপ্ত ( 1911 - 1931 ) :------
1911 সালের 6'ই ডিসেম্বর তদানীন্তন ঢাকা জেলার যশোলঙে জন্মগ্রহণ করেন বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত | দীনেশের ডাক নাম ছিল - নসু | পিতা নাম ছিল সতীশচন্দ্র গুপ্ত এবং মাতার নাম ছিল বিনোদিনী দেবী | চার ভাই এবং চার বোনের মধ্যে দীনেশ ছিলেন পিতামাতার তৃতীয় সন্তান | সতীশচন্দ্র ছিলেন ডাকবিভাগের কর্মচারী | চাকুরী সূত্রে তিনি কিছু কাল গৌরীপুরে ছিলেন | সেখানেই দীনেশের শিক্ষারম্ভ হয় | পরে যখন দীনেশের নয় বছর বয়স হয় তখন তিনি ভর্তি হন ' ঢাকা কলেজিয়েট ' স্কুলে | কিশোর বয়সে দীনেশ ' বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স ' এ যোগদেন | 1926 সালে ঢাকা বোর্ড থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি মেদিনীপুরে তাঁর বড়োদাদা যতীশচন্দ্রের কাছে বেড়াতে যান | এই সময় থেকেই মেদিনীপুর শহরে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার সুপ্ত বাসনা তার মধ্যে জাগে | তবে দলের নির্দেশে সেবার তাঁকে ঢাকায় চলে আসতে হয়েছিল বলে তিনি মেদিনীপুরে বিশেষ কিছুই করতে পারেননি | 1928 সালে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে আই.এস.সি পরীক্ষা দেন | কিন্তু সেই পরীক্ষায় দীনেশ অকৃতকার্য হন | এরপর তিনি মেদিনীপুর গিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন | এই সময় মেদিনীপুরে বিভিন্ন শাখা স্থাপনের দায়িত্ব তাঁকে
দেওয়া হয় | ঢাকা কলেজে পড়ার সময় 1928 সালে দীনেশ ' ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে'র কলকাতা সেশনের প্রাক্কালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস সংগঠিত ' বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স ' এ যোগদান করেন | শীর্ঘই এই সংগঠন একটি সক্রিয় বিপ্লবী সংগঠনে পরিবর্তিত হয় এবং কুখ্যাত ব্রিটিশ অফিসারদের হত্যা /
নিশ্চীর্ণ করার পরিকল্পনা করেন | স্থানীয় বিপ্লবীদের আগ্নেয়াস্ত্র চালানো শেখানোর জন্য দীনেশ গুপ্ত কিছু সময় মেদিনীপুরে ছিলেন | তাঁর প্রশিক্ষিত বিপ্লবীরা ডগলাস , বার্জ এবং পেডি ......এই তিনজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে পরপর হত্যা করেছিল |

বিনয় কৃষ্ণ বসু ( 1908- 1930 ) :---------
1908 সালের 11'ই সেপ্টেম্বর মুন্সিগঞ্জ জেলার রোহিতভাগ গ্রামে বিনয় কৃষ্ণ বসু জন্ম গ্রহণ করেন | তাঁর পিতা রেবতীমোহন বসু ছিলেন একজন প্রকৌশলী | ঢাকায় ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাশ করার পর বিনয় ' মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুল ' এ ভর্তি হন | এ সময় তিনি ঢাকার ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের সংস্পর্শে আসেন এবং যুগান্তর দলের সাথে জড়িত থাকার জন্য তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে তাঁর পড়ালেখা শেষ করতে পারেননি | বিনয় ও তাঁর সহযোদ্ধারা ' বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স ' দলে যোগ দেন 1928 সালে | 1930 সালের 9'ই আগষ্ট সাধারণ বেশভূষায় নিরাপত্তা গন্ডিকে ফাঁকি দিয়ে অত্যাচারী ইন্সপেক্টর লোম্যনের খুব কাছে এসে তাকে গুলি করেন বিনয় | ঘটনাস্থলেই লোম্যানের মৃত্যু হয় | এরপর বিনয় কলকাতায় চলে আসেন |
এপর্যন্ত এই তিনজন বিপ্লবীদের কার্যকলাপকে পৃথক পৃথক ভাবে আলোচনা করছিলাম. | এবার শেষপর্যায়ে আমি এই তিনজন বিপ্লবীর ' রাইটার্স বিল্ডিং ' আক্রমণ করার ঘটনা বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করব যা ইতিহাস ' অলিন্দ যুদ্ধ ' নামে খ্যাত | বন্দী বিপ্লবীদের উপর অমানসিক অত্যাচার করার জন্য জেলের বাইরের ' বি.ভি ' র বিপ্লবীরা কুখ্যাত ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এন.এস.সিম্পসন কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন | তৎকালীন সময়ে কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারে ছিল ব্রিটিশ শাসকদের সচিবালয় | যার নাম রাখা হয়েছিল ' রাইটার্স ভবন ' | সেই ভবনেই উচ্চ পদস্থ ব্রিটিশ আমলারা নিয়মিত অফিস করতেন | বিনয় বাদল এবং দীনেশকে এই ভবন আক্রমণ করে সিম্পসন কে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয় | 1930 সালের 8ই ডিসেম্বর দুপুর 12 টায়. তারা শুরু করলেন তাদের অ্যাকশন | প্রথমেই তারা সিম্পসন কে হত্যা করে সহযোদ্ধা দের হত্যার প্রতিশোধ নিলেন | এরপর ব্রিটিশ গুর্খা বাহিনীর সঙ্গে তাদের লড়াই শুরু হয় | এটিই ইতিহাসে ' অলিন্দ যুদ্ধ ' পরিচিত | পালানো অসম্ভব দেখে ' পটাশিয়াম সায়ানাইড ' খেয়ে তিন জনই আত্মহত্যা হত্যার চেষ্টা করেন | বিষক্রিয়ায় অতিঅতিদ্রুমৃত্যু হওয়ার আশঙ্কায় এবার তিনজনই তাদের পিস্তলের শেষগুলিটি নিজেদের মাথা লক্ষ্য করে চালিয়েদেন | ঘটনাস্থলেই বাদলের মৃত্যু হয় | বিনয় ও দীনেশ কে গুরুতর আহত আবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়. | বিনয় ছিলেন মেডিকেলের ছাত্র তাই মৃত্যুকে কিভাবে বরন করতে হয় তা তিনি জানতেন | তাই 1930 সালের 12 ই ডিসেম্বর রাতে বিনয় নিজের মাথার ব্যান্ডেড খুলে ক্ষত জায়গায় আঘাত করে মৃত্যুকে বরণ করেন | আর দীনেশ কে 1931 সালের 7ই জুলাই ফাঁসি দেওয়া হয় |
আজ আমাদের শেষ স্বাধীন | কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমান নেতাগণ এই সব বলিদান কে ভুলে গিয়েছে | তারা জানে না যে এই দেশকে স্বাধীন করার জন্য কত মায়ের কোলখালি হয়েছে | তারা যদি এইসব দেশনায়কদের বলিদান কে জানত তাহলে তারা আর হিৎসাকে উসকে দিত না তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আসত না তারা একে অপরে শুধু মাত্র দলীয় পার্থক্যের জন্য মারতে উদ্যত হত না ......

হিটলার

এযাবৎ অ্যাডলফ হিটলার সম্পর্কিত পোস্ট গুলিতে তাঁর নানা ধরনের কর্মকান্ড তুলে ধরেছি | কিন্তু আজ হিটলারের কুকর্ম গুলিকে দূরে রেখে ইভা ব্রাউনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কে তুলে ধরব | হিটলারের প্রেমিকা ছিলেন ইভা আন্না পাউলো ব্রাউন | এবং পরবর্তীতে হিটলার তাঁকে বিয়েও করেছিলেন | কিন্তু বিবাহের 40ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে হিটলার সস্ত্রীক আত্মহত্যা করেছিলেন | কার্যত বাধ্য হয়েই হিটলার কে আত্মহত্যা করতে হয়েছিল | সে যাইহোক হিটলার অবশ্য ইভাকে অন্যত্র গিয়ে সুন্দর জীবন যাপনের পরামর্শ দিয়েছিলেন | কিন্তু ইভা হিটলার কে প্রচন্ড ভালোবাসতেন | ফলে তিনি অন্যত্র না গিয়ে প্রেমিক হিটলারের সঙ্গে জীবন বিসর্জন দেওয়াকেই শ্রেয় মনে করেছিলেন এবং একই সঙ্গে দুজনে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেন |

হিটলারের জন্ম 1889সালের 20শে এপ্রিল আর ইভার জন্ম 1912সালের 12ই ফেব্রুয়ারি তাদের মধ্যে বয়সের বিস্তর ব্যবধান ছিল | ইভা হিটলারের থেকে 23বছরের ছোটো ছিলেন | কিন্তু বয়সে ব্যবধান তাদের সম্পর্কে বাধাদান করেনি | হিটলারের সঙ্গে ইভার প্রথম দেখা হয় মিউনিখে | তখন ইভার বয়স ছিল 17| ইভা হিটলারের পার্সোনাল ফটোগ্রাফারের সহকারী ও মডেল হিসাবে কাজ করতেন | প্রথম দেখার দু বছর পর থেকে তাদের মধ্যে নিয়মিত সাক্ষাৎ হত | 1936সালের পর থেকে হিটলারের বার্গহফ নামের বাড়িতেই বসবাস শুরু করেন ইভা | হিটলারের এই বাড়ি ছিল ব্যাভারিয়ান পর্বতশৃঙ্গের বার্খটেসগার্ডেন
মিউনিসিপ্যালিটি এলাকায় | ইভা জনসমক্ষে তেমন আসতেন না | তবে 1942 সালে তাঁর বোনের সাথে হিটলারের এক সামরিক অফিসারের বিবাহ হলে তাঁকে প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায় |
1945সালের 30শে এপ্রিল আত্মহত্যার পূর্বেও ইভা একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন 1936সালে | খুব সম্ভবত হিটলারের সাথে মনমালিন্যের জন্যেই সেবার তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন | ইভা ব্রাউনের ধূমপান করা, অতিরিক্ত প্রসাধন সামগ্রীর ব্যবহার এবং ছোটো পোশাক পরে রোদ পোহানো ইত্যাদি নানা কার্যকলাপ হিটলার কে ক্ষুব্ধ করত | তিনি এসব পছন্দ করতেন না |
1945সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিনগুলিতে হিটলারের পতন যখন আসন্ন তখন হিটলার অধিকাংশ সময়ই ব্যাঙ্কারে থাকতেন | এই ব্যাঙ্কারেই হিটলার এবং ইভার বিবাহ হয় 1945সালের 29শে এপ্রিল এবং বিবাহের পর দিন 1945সালের 30শে এপ্রিল তারা আত্মহত্যা করেন |
 

HITLAR

হিটলার সম্পর্কিত পূর্ববর্তী দুটি আলোচনায় আমি যথাক্রমে হিটলারের পিতার বৈবাহিক ঘটনা ক্রম এবং তারপরের আলোচনায় হিটলার কিভাবে জার্মানির শাসনক্ষমতা দখল করেছিলেন তা নিয়ে আলোচনা করেছি | আজ আমি হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানি কিভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করল তানিয়েই আলোচনা করব |

1935 সালে হিটলার জার্মানিতে নতুন আইন চালু করে দেশের নাগরিকদের দুটি ভাগে ভাগ করে দিলেন | ( জেন্টিল এবং জু) জেন্টিল অর্থাৎ জার্মান আর জু অর্থায় ইহুদী | এই আইনে বলা হল জার্মানরা দেশের প্রকৃত নাগরিক আর জু 'রা জার্মানিতে বসবাসকারী হলেও তারা এদেশের নাগরিক নন | প্রয়োজনে তাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে |
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল মিত্রপক্ষ | কিন্তু 1933 সালে হিটলার জার্মানির হাল ধরার সাথে সাথে জার্মানির অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে | হিটলার জার্মানির শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই ভার্সাই চুক্তির শর্তগুলি মানতে অস্বীকার করেন | 1934 সালে হিটলার রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে নিজেকে জার্মানির ফুয়েরার হিসাবে ঘোষণা করেন এবং অল্পদিনের মধ্যেই নিজেকে দেশের অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন | হিটলার তাঁর সমস্ত ক্ষমতা নিয়োগ করেছিলেন দেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে | এই কাজে তাঁর সহযোগীরা ছিলেন কয়েকজন সুদক্ষ সেনানায়ক এবং প্রচারবিদ | কিছুদিনের মধ্যেই হিটলার ভার্সাই সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে রাইনল্যান্ড অধিকার করেন | অষ্ট্রিয়া এবং ইতালি একসূত্রে আবদ্ধ হয় জার্মানির সাথে | ইতালির সর্বাধিনায়ক ছিলেন মুসোলিনী | একদিকে ইতালীর ফ্যাসিবাদী শক্তি অন্যদিকে নাৎসি জার্মানি | বিশ্বজয়ের স্বপ্নে উন্মত্ত হয়ে ওঠে ইতালি | প্রথমে আলবেনিয়া ও পরে ইথিওপিয়ার বেশ কিছু অংশ দখল করে নেয় ইতালি | অবশেষে হিটলার পোল্যান্ডের কাছে ডানজিগ ও পোলিশ করিডর দাবি করলেন | যাতে এই অঞ্চলে সৈন্য সমাবেশ করতে পারেন | পোল্যান্ডের সরকার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে | পোল্যান্ডের ধারণা ছিল হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে ইউরোপের অন্যান্য দেশ পোল্যান্ডের পক্ষ নেবে | এবং ইউরোপের সম্মিলিত বাহিনীর কাছে হিটলার পরাজিত হবে | কিন্তু 1939 সালের 1লা সেপ্টেম্বর জার্মান বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমণ করলে মাত্র 15দিনের মাথায় পোল্যান্ড পরাজিত হয় এবং জার্মানি পোল্যান্ড অধিকার করে | পোল্যান্ডের পর হিটলার দখল করলেন নরওয়ে ও ডেনমার্ক | নরওয়েতে বিরাট সংখ্যক ব্রিটিশ সেনা মোতায়েন ছিল | এই আক্রমণের ফলে অধিকাংশ ব্রিটিশ সেনা নিহত হয় | এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলিন পদত্যাগ করলেন এবং নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন চার্চিল | এরপর হিটলার ফ্রান্স আক্রমণের পরিকল্পনা করেন | ফ্রান্স নিজ সুরক্ষার জন্য. জার্মান সীমান্তে দূর্ভেদ্য ব্যূহ সৃষ্টি করেছিল | যাকে বলা হতো ম্যাজিনো | বেলজিয়াম আক্রমণ করে সেই দেশের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের সীমান্তে উপস্থিত হলো জার্মান বাহিনী | সোঁদায় তুমুল যুদ্ধের পর ফরাসি বাহিনী পরাজিত হয় | ফরাসিদের এই বিপর্যয়ের সুবিধা নেওয়ার জন্য ইতালি নিজেকে জার্মানির মিত্র হিসাবে ঘোষণা করে যুদ্ধে যোগ দেয় | এই ভাবে সমগ্র ইউরোপ -আফ্রিকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ আগুন | আজ এ পর্যন্তই থাক পরবর্তী আলোচনায় আরও নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাবে |

হিটলার

হিটলার সম্পর্কিত পূর্ববর্তী আলোচনায় আমি হিটলারের পিতা অথাৎ এলোইস হিটলারের বৈবাহিক সম্পর্কের ঘটনাক্রম তুলে ধরেছিলাম | আজ আমি হিটলার কিভাবে জার্মানির ক্ষমতা দখল করলেন তা নিয়েই আলোচনা করব | মায়ের মৃত্যুর পর সংসারের বন্ধন থেকে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করেন | এবং ভিয়েনা চলে আসেন | ভিয়েনাতে এসে তিনি মজুরের কাজ শুরু করেন | এরপর রং বিক্রি করতে আরম্ভ করেন | এই ভিয়েনা অবস্থান কালেই তাঁর মধ্যে জেগে ওঠে চরম ইহুদী বিদ্বেষ | কারণ তখন জার্মানির অধিকাংশ কলকারখানা , সংবাদপত্রের মালিক ছিল ইহুদীরা | দেশের অর্থনীতির অনেকটাই ইহুদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হত | কিন্তু হিটলার কিছুতেই এটিকে মেনে নিতে পারছিলেন না যে, জার্মান দেশে বাস করে জার্মানিদের উপরেই প্রভুত্ব করবে ইহুদীরা | 1912 সালে তিনি জার্মানি ছেড়ে এলেন মিউনিখে | দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে হিটলারের কেটে গেল আরও দুটি বছর | এরপর 1914 সালে শুরু হল প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ | হিটলার সৈনিক হিসাবে যুদ্ধে যোগ দিলেন | যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গোটা জার্মানি জুড়ে দেখা দিল বিশৃঙ্খলা আর অনাহার | তার মধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠল বিভিন্ন বিপ্লবী দল, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল | এদের উপর গোয়েন্দা গিরি করার জন্য হিটলার কে নিয়োগ করল কতৃপক্ষ | সেই সময় প্রধান রাজনৈতিক দল ছিল লের্বার পার্টি | হিটলার সেই পার্টির সদস্য হলেন | অল্পদিনের মধ্যেই পাকাপাকিভাবে পার্টিতে নিজের স্থান করে নিলেন হিটলার | এক বছরের মধ্যেই তিনি হলেন পার্টি প্রধান | দলের নতুন নাম রাখা হয় ' ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স পার্টি ' | পরবর্তীকালে এই দলকেই বলা হত ' নাৎসি পার্টি ' | 1920 সালের 24ফেব্রুয়ারি প্রথম নাৎসি দলের সভা ডাকা হল | এতেই হিটলার প্রকাশ করলেন তাঁর পঁচিশ দফা দাবি | এরপর হিটলার প্রকাশ করলেন স্বস্তিকা চিহ্ন যুক্ত দলের পতাকা | ক্রমশই নাৎসি দলের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে | তিন বছরের মধ্যেই দলের সদস্য সংখ্যা হয় প্রায় 5600 0 এবং এটি জার্মানির রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রাহন করতে থাকে | হিটলার চেয়েছিলেন মিউনিখে তাঁর দল ছাড়া অন্য কোনো দলের যাতে অস্তিত্ব না থাকে | এক সময় তাঁর পরিকল্পিত এক রাজনৈতিক চক্রান্ত ব্যর্থ হয় | এবং পুলিশের হাতে ধরা পড়েন | তাঁকে এক বছরের জন্য ল্যান্ডসবার্গের
পুরোনো দূর্গে বন্দি করে রাখা হয় | জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আবার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন হিটলার | তার উগ্র মতবাদ. , বলিষ্ঠ বক্তব্য জার্মানদের আকৃষ্ট করে | দলে দলে যুবক তাঁর দলের সদস্য হতে আরম্ভ করে | সমস্ত দেশে জনপ্রিয় নেতা হয়ে উঠলেন হিটলার | 1933 সালের নির্বাচনে বিপুল ভোট পেলেন কিন্তু সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেলেন না | পার্লামেন্টের 647টির মধ্যে তার দলের আসন ছিল 288 | এর ফলে হিটলার বুঝতে পারলেন যে ক্ষমতা যদি দখল করতে হয় তাহলে অন্য পথ ধরতে হবে | কোনো দল সংখ্যা গরিষ্ঠতা না পাওয়ায় হিটলার পার্লামেন্ট ভেঙে দিলেন | এবার ক্ষমতা দখলের জন্য শুরু হল তাঁর ঘৃণ্য চক্রান্ত | বিরোধীদের অনেকেই খুন হলেন | অনেকে মিথ্যা অভিযোগে জেলে গেল | বিরোধী দলে নিজের দলের লোক প্রবেশ করিয়ে দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করলেন | অল্পদিনের মধ্যেই বিরোধী পক্ষকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে হিটলার হয়ে উঠলেন শুধু নাৎসি দলের নয়. , সমগ্র জার্মানির ভাগ্য বিধাতা | এই ভাবে হিটলার বিভিন্ন উত্থান পতনের. মধ্য দিয়ে নিজেকে জার্মানির অধিপতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন. | পরবর্তী আলোচনায় হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানির প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে যোগদান নিয়ে আলোচনা করব |


অ্যাডলফ হিটলার

বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম প্রধান বিতর্কিত এবং একই সঙ্গে চর্চিত চরিত্র হলেন অ্যাডলফ হিটলার | হিটলারকে নিয়ে প্রায় প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কমবেশি কৌতুহল লক্ষ্যকরা যায় | তবে আজ আমি হিটলারের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে আলোচনা করব না | কীভাবে হিটলারের জন্ম হল তা নিয়েই আলোচনা করব অথাৎ হিটলারের পিতার বিবাহের ঘটনাক্রম সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করব |
হিটলারের মূল নাম হল অ্যাডলফ | পিতা এলোইস হিটলারের নামানুসারে তাঁর নাম হয়েছে অ্যাডলফ হিটলার | হিটলারের পিতা এলোইস হিটলারের ( হিটলারের পিতার নাম এলোইস হিটলার) প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল আন্না গ্লাস্ল হোরের | এই স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে 19 বছর বয়সী ফ্রান্সিস্ক মাৎজেল্সবার্গার
নামক চাকুরানির সাথে হিটলারের পিতার প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে |কিন্তু রোমান ক্যাথলিক মতে তিনি মাৎজেল্সবার্গার কে বিবাহ করতে ব্যর্থ হন
| কিন্তু মাৎজেল্সবার্গারের সাথে হিটলারের পিতা এলোইস হিটলারের সম্পর্ক অটুট থাকে |1876 সালে ক্লারা পোলজল এই পরিবারে পরিচারিকা হিসাবে যোগদান করেন| মূলত ক্লারা ছিলেন এলোইসের দূর সম্পর্কের ভাতিজি | 1880 সালের 7নভেম্বর এলোইসের প্রথম স্ত্রী আন্না গ্লাল্স হোরের সাথে এলোইসের বিবাহ বিচ্ছেদ হয় | অবশ্য এই বিবাহ বিচ্ছেদে গির্জার অনুমোদন ছিল না | 1882 সালের 13ই জানুয়ারি এলোইস এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মাৎজেল্সবার্গারের প্রথম সন্তানের জন্ম হয় | এই সন্তানের নাম রাখা হয়েছিল এলোইস মাৎজেল্সবার্গার | 1883 সালের 6ই এপ্রিল রোগে আক্রান্ত হয়ে এলোইসের প্রথম স্ত্রী আন্না গ্লাল্স হোরের মৃত্যু হলে এলোইস এবং মাৎজেল্সবার্গারের বিবাহে আর কোনো আইনি বাধা থাকে না এবং ওই বছরের 22শে মে উভয়ের বিবাহ সম্পন্ন হয় | এরপর মাৎজেল্সবার্গার দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের জন্য ভিয়েনা যান এবং সেখানে এ্যাঞ্জেলা হিটলারের জন্ম হয় | এই সময় মাৎজেল্সবার্গার ফুসফুসের দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন | তাঁকে র্যান্সহোফেন গ্রামে এনে রাখা হয় | এই সময় তাঁকে দেখা শোনার জন্য ক্লারা কে পুনরায় আনা হয় | 1884 সালের 10ই আগষ্ট মাৎজেন্সবার্গার মৃত্যুবরন করেন | এর কিছুদিন পর এলোইসের দ্বারা ক্লারা গর্ভবতী হন | এরপর তিনি ক্লারাকে বিবাহ করার উদ্যোগ নিলে দূর সম্পর্কীয় ভাতিজি বলে গির্জা বাধা দেয় | পরে 1885 সালে 7ই জানুয়ারি গির্জা এই বিবাহে সম্মতি দেয় | বিবাহের 5মাস পরে অথাৎ 1885
সালের 17ই মে তাঁর প্রথম পুত্র গুস্তাভের জন্ম হয় | 1886 সালের 25শে সেপ্টেম্বর জন্ম নেয় তাঁর দ্বিতীয় কন্যা আইডা | 1887 সালে তাঁর তৃতীয় সন্তান ওট্টো জন্মগ্রহনের পরপরই মারা যান | ডিফথেরিয়া রোগে ওট্টো মারা যায় | 1888 সালের. 2রা জানুয়ারি কন্যা আইডা মারা যায় | এরপর 1889. সালের 20 শে এপ্রিল জন্মগ্রহন করেন অ্যাডলফ হিটলার | হিটলার ছিলেন তাঁর পিতার তৃতীয় স্ত্রীর তৃতীয় সন্তান | পরের আলোচনায় হিটলারের রাজনৈতিক জীবনকে তুলে ধরব | আজ এ পর্যন্তই থাক|


পুরানো কৃষ্ণনগর